History
বরিশাল সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বরিশাল এর তথ্য- বরিশাল সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-এর প্রতিষ্ঠাকালীন নাম ছিল বরিশাল সদর বালিকা বিদ্যালয়। বরিশাল শহরের কয়েকজন পাদ্রী ও কয়েকজন সিস্টার ১৮৭৩ সালে সর্বপ্রথম বালিকাদের জন্য প্রাইমারি বিদ্যালয় স্থাপন করেন। তাদের এই উদ্যোগে সর্বাধিকভাবে সহাযতা করেছিলেন বরিশালের কাঁচাবালিয়ার স্বনামধণ্য গুহ পরিবার, রহমতপুরের জমিদার পরিবার এবং সমাজসেবী শ্রী বিজয় সেন। বর্তমানে বগুড়া রোডে যেখানে বিদ্যালয়টি স্থাপিত সেখানেই প্রথম স্বল্প পরিসর স্তানে প্রাইমারি বিদ্যালয়টি তার পথচলা শুরু করে। গুহ পরিবারের সম্পত্তিতে তাদের সম্মতিতে প্রাথমিকভাবে বিদ্যালযের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রকৃতপক্ষে সে সময়ে বালিকাদের এবং মহিলাদের কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল না। আধুনিক শিক্ষায় কিছু সম্ভ্রান্ত ও ধনী পরিবার এবং সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পরিবার থেকে আগত কিছুসংখ্যক বালিকারা এই প্রাইমারি বিদ্যালয়ে পড়তে শুরু করে। প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল খুবই সীমিত। বিংশ শতাব্দীর প্রথম পর্ব থেকেই ছাত্রী সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে। সাথে সাথে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোও উন্নত হয়ে নতুন রূপ পেতে শুরু করে। এই প্রাইমারি বিদ্যালয়ে যে সব ছাত্রী অধ্যায়ন করেছে তারা নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিল। এই ছাত্রীরাই মূলত উদ্যোগী হয়ে বিদ্যালয়টিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উন্নীত করার বিভিন্ন প্রচেষ্ঠা চালায়। * তাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম সমাজসেবী ব্যক্তিত্ব শ্রী শরৎচন্দ্র গুহ মহোদয় সাহায্যের হস্ত প্রসারিত করেন। তিনিই ছিলেন বরিশাল সদর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান উদ্যোক্তা। বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় যেখানে অবস্থিত সেখানের সবটুকু ভূমির তিনি মালিক ছিলেন। তিনি তাঁর সম্পত্তি নিঃশর্তভাবে শুধুমাত্র নারী শিক্ষা বিস্তারের জন্য রেজিষ্ট্রি করে দান করেছেন। ১৮৭৩ সালে কাঁচাবালিয়ার যে গুহ পরিবার প্রাইমারি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য এগিয়ে এসেছিল শ্রী শরৎচন্দ্র গুহ তাদেরই বংশের একজন কীর্তিশান ব্যক্তিত্ব। শ্রী শরৎচন্দ্র গুহ ছাড়া ও যেসব ব্যক্তিত্ব এই মহতী কার্য সম্পাদনের জন্য এগিয়ে এসেছিলেন তার মধ্যে মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের ভ্রাতুষ্পূত্র শ্রী সরল কুমার দত্ত, বাহাদুর হেমায়েত উদ্দিন, মৌলভী মফিজ উদ্দিন এ্যাডভোকেট, আইনজীবী অবনীনাথ ঘোষ, জনাব মোফাজ্জেল হক প্রমুথ খ্যাতনামা ব্যক্তিদের নাম সবিশেষ উল্লেখ যোগ্য। তৎকালীন বরিশাল আইনজীবী সমিতির কয়েকজন আইনজীবী এবং রহমতপুরের জমিদার পরিবার এ সময়ে বেশ কিছু অর্থ সাহায্য করেছিলেন বলে শোনা যায়। শ্রী শরৎচন্দ্র গুহ বিদ্যালয়ের জন্য দানপত্র মারফত যে জমি রেজিষ্ট্রি করে দিয়েছিলেন সে দলিলে জনাব মোফাজ্জল হক ও জনাব আব্দুর রব নামে বরিশালের দু’জন ব্যক্তি সাক্ষী হিসাবে স্বাক্ষর দিয়েছেন। ১৯২৩ সালে বরিশাল সদর বালিখা উচ্চ বিদ্যালয় পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করার পর দ্রুতগতিতে বিস্তার লাভ করতে থাকে। শিক্ষার মান ও সেই সাথে উন্নত হতে থাকে। সে সময়ে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হিসাবে নিয়োগ দেবার মত বরিমালে হিন্দু বা মুসলিম সমাজে কেউ ছিল না বললেই চলে। সে সময়ের সামাজিক বাস্তব অবস্থা অনুধাবন করে উদ্যোক্তারা কোন পুরুষকে বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান বা অন্য কোন শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দান করা থেকে বিরত ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই তখন খ্রিষ্টান মিশনারীদের মধ্য থেকে প্রধান মিক্ষিকা ও অন্যান্য বেশ কিছু শিক্ষিকা নিয়োগ করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষিকা হিসাবে মিস ডরোথী দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। ১৯২৩ থেকে ১৯৩৫ সন পর্যন্ত তিনি প্রধান শিক্ষিকা হিসাবে সার্থকভাবে তার দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি অবসর গ্রহণ করার পর পর্যায়ক্রমে মিস মার্থা এবং মিস ফ্রান্সিস প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। মিশনারীদের পর ১৯৪৫ সালে মিস স্নেহলতাদাশ গুপ্ত (কবি জীবনানন্দ দাশের পিসি) প্রধান শিক্ষিকা হিসাবে নিয়োগ লাভ করেন। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে তিনি দেশ ত্যাগ করেন। এ পর্যায়ে বিদ্যালয়ের প্রধান উদ্যোক্তা ও ভূমিদাতা শ্রী শরৎ চন্দ্র মহোদয়ের সুযোগ্যা কন্যা মিস শান্তি সুধা গুহ প্রধান শিক্ষিকা হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। অসাধারণ প্রজ্ঞাবান দক্ষ ও নিবেদিত প্রাণ এই প্রধান শিক্ষিকার তত্ত্ববধানে বিদ্যালয়ের উন্নতি দ্রুত বেগবান হয়ে ওঠে। ১৯৩৮ সালে তিনি একজন সহকারি শিক্ষিকা হিসাবে এই বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। সহকারি শিক্ষিকা হিসেবে ১৯৩৮ সন থেকে ১৯৪৮ সন পর্যন্ত এবং ১৯৪৮ সন থেকে ১৯৬৮ সন এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রধান শিক্ষিকা মোট ত্রিশ বছর অপরিসীম নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে এই বিদ্যালয়টি শুধুমাত্র বালিকা বিদ্যালয় হিসাবে নয় বৃহত্তর বরিশাল জিলার (বরিশাল বিভাগ ) সকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানে উত্তীর্ণ হবার মর্যাদা লাভ করে। উল্লেখ্য সে সময়ে তিনি তমযা-ই পাকিস্তান উপাধি পেয়েছিলেন। ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল সরকার বরিশাল সদর বিদ্যালয়টিকে সরকারি বিদ্যালয়ে রুপান্তরিত করে। বিদ্যালয়টির নতুন নামকরণ করা হয় বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। স্বাভাবিক ভাবেই সেই থেকে বিদ্যালয়টির অবকাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তন এবং উন্নয়নের ধারা সূচীত হয়। এর চলমানতা এখনও অব্যাহত আছে। সকল প্রধান শিক্ষিকাগণ অসাধারণ যোগ্যতা, প্রজ্ঞা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়ে স্বনাম ধন্যা হয়ে আছেন। তবে বিদ্যালয়ের মূল উদ্যোক্তা ও ভূমিদাতা শ্রী শরৎ চন্দ্র গুহ মহোদয়ের সুযোগ্য কণ্যা মিস শান্তি সুধা গুহ সহকারি শিক্ষিকা ও প্রধান শিক্ষিকা হিসাবে মোট ত্রিশ বছর এক বিশিষ্টতার ছাপ রেখে গেছেন। সেই মিস শান্তি সুধা গুহ তমযা-ই পাকিস্তান উপাধি পেয়েছিলেন। তৎকালিন সামরিক গর্ভনর আজম খান বিদ্যালয় পরিদর্শনে এসে তাাঁকে পাকিস্তানের রত্ন বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং বলেছিলেন আপনার অবসরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বর্তমানে বরিশাল বিভাগে তথা বরিশাল বোর্ডের অধীনে ছাত্রী সংখ্যা, সংস্কৃতিক এবং প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা (পি.এস.সি), জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা (জেেএস.সি) এবং মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় (এস.এস.সি) ফলাফলের ভিত্তিতে বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এক সীমাহীন উচ্চতায় মর্যাদা ও গুরুত্ব বহন করে এখন পর্যন্ত শ্রেষ্ঠস্থান ধরে রাখছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভূমিকা ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন সবচেয়ে বড় গৌরব ও অহংকার। মুক্তিযুদ্ধের সুমহান ইতিহাসের সাথে বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অভদানের কথা স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধের গতিধারার মধ্য দিয়ে এই বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে যে ইতিহাস রচিত হয়েছে তা নিঃসন্দেহে অনন্য ও অতুলনীয়। একাত্তারের ২৫ মার্চের কালরাত। সেদিন মধ্য রাতে হাজার হাজার শ্লোগান মুখর সংগ্রামী জনতা বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তা বগুড়া রোডে জমায়েত হতে থাকে। রাস্তার ওপাড়ে অনেকটা জুড়ে একটি বসতি এলাকা নাম পেস্কার বাড়ি। সে সময় এখানে বাস করতেন তৎকালীন আওয়ামীলীগের বৃহত্তর বরিশার জেলার কমিটির সম্পাদক ও ১৯৭০ এর নির্বাচনে নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য (এমপি) জনাব নুুরুল ইসলাম মঞ্জুর। রাত এগারোটা নাগাদ তিনি টেলিফোন যোগে ঢাকায় নিরীহ নিরস্ত্র বাঙ্গালীর উপর বর্বরোচিত ঘৃণ্য আক্রমণের সংবাদ পেয়ে যান। এরপরে ঢাকার সাথে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই সকল স্তরের হাজার-হাজার জনতা মঞ্জুর সাহেবের বাসার সামনে সমবেত হতে থাকে। সংগ্রামী জনতা দুইভাগে বিভিক্ত হয়ে এক অংশ জেলা প্রশাসকের প্রশাসন ভবনের চত্তরে এব ওপর অংশ বরিশাল পুলিশ লাইন কম্পাউন্ডে সমবেত হয়। শেষ রাতে জেলা প্রশাসনের ওয়্যারলেস যন্ত্রে মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার গোষণার বার্তা তাদের কাছে এসে পৌঁছে। কালেক্টরেটের ওয়ারলেস যনেত্্রর সাহায্যে এই ঘোষণা বার্তা তাৎক্ষনিকভাবে পটুয়াখালী, ভোলা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, খুলনা প্রভৃতি জিলায় পোীছান হয়। একই সময়ে অন্য দলটি পুলিশ লাইনের অস্ত্রগার থেকে প্রচুর অস্ত্র সংগ্রহ করে ভোররাতে পেষ্কার বাড়ি ফিরে আসে। ২৬ মার্চ সকাল নয়টা নাগাদ বরিশালের তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সংগ্রামী জনতা অস্ত্রসস্ত্র সহ বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এসে সমবেত হয়। বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে শত-সহস্র সংগ্রামী জনতা পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাত থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য শপথ গ্রহণ করে। বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে বসেই নেতৃস্থানীয় রাজনৈতকি ব্যক্তিবর্গ এবং মুক্তি চেতনায় উজ্জীবিত বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ প্রশাসনও পুলিশ বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ আলোচনায় বসে তাৎক্ষনিকভাবে একটি যুগান্তাকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। মুক্তিযুদ্ধ এবং বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনার জন্য তারা একটি শক্তিশালী সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। এগারটা নাগাদ বিদ্যালয়ের ‘ফ্লাগ স্টান্ডে’ এ স্বাধীন বাংলাদেশের ও আওয়ামীলীগের পাতাক উত্তোলন করে মুক্তিযুক্তে অবতীর্ণ হবার শপথ গ্রহণ করে। আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত মুক্তিবাহিনী। সংগ্রাম পরিষদ বরিশাল সরকারি বাালিকা উচ্চ বিদ্যালয়কে স্বাধীন বাংলা প্রশাসনের সচিবালয় হিসাবে ঘোষণা করে। সেদিনই সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনকে গুরুত্বপূর্ণ এগারটি বিভাগ তথা মন্ত্রণালয়ে বিভক্ত করে পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করা হয়। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষে বিভিন্ন বিভিন্ন মন্ত্রাণালয়ের অফিস নিজনিজ বিভাগের কাজ শুরু করে। এবাবে এই বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন বাংলার প্রথম সচিবালয়। এই মন্ত্রণালয় ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের আম্রকাননে (মুজিব নগর) আধুনিকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহন করার পূর্ব পর্যন্ত এই বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত সংগ্রাম পরিষদ ও সচিবালয়ই স্বাধীন বাংলার পক্ষে প্রথম স্বঘোষিত সরকার হিসাবে দায়িত্ব পালন করে। এই সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে তৎকালীন সরকারি ও বেসরকারি প্রশাসনের গুরুত্বয়র্ণ সব কমর্কতা কর্মচারীবৃন্দ সাবিকভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছে। জেলা প্রশাসনের (কারেক্টরেটের) বেশ কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী এই সচিবালয়ে নিয়মিতভাবে কর্মরত ছিল। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার কক্ষে সংঘ্রাম পরিষদরে প্রধান সম্বয়কারীর সভাপতিত্বে প্রতিদিন পরিষদের বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের নিয়ে সভা অনুষ্ঠিত হত। সবার সিদ্ধান্তগুরো বিজ্ঞপ্তি বা নির্দেশ আকারে সর্বত্র প্রচার করা হত। সরকারি ও বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠান পরিষদের এই নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করত। ব্যংকের আর্থিক লেনদেন সংগ্রাম পরিষদের অনুমতি নিয়ে করা হত। * সংগ্রাম পরিষদের সচিবালযের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধানগণ - ১) বেসামরিক বিভাগ - জনাব নুরুল ইসলাম মঞ্জুর (এম.এন.এ) ২) প্রতিরক্ষা বিভাগ - জনাব মেজর এম.এ. জলিল ৩) অর্থ বিভাগ - জনাব আব্দুল মালেক খান (সভাপতি, জেলা আওয়ামীলীগ) ৪) খাদ্য বিভাগ- জনাব মহিউদ্দিন আহমেদ (এম.পি.এ) ৫) বিচার বিভাগ- জনাব আমিনুল হক চৌধুরী (এ্যাডভোকেট) ৬) ত্রাণ বিভাগ- জনাব আমির হোসেন আমু ((এম.পি.ও) ৭) জ্বালানী বিভাগ - জনাব শামসুল হক (এম.এন.এ) ৮) তথ্য বিভাগ - জনাব ইউসুফ হোসেন হুমাযুন (এ্যাডভোকেট) ৯) সিভিল ডিফেন্স বিভাগ - জনাব হাসান ইমাম চৌধুরী ( এ্যাডভোকেট) ১০) যোগাযোগ বিভাগ- জনাব সরদার জালাল উদ্দিন (এ্যাডভোকেট) ১১) স্বাস্থ্য বিভাগ - জনাব ডাঃ হরমত আলী (চিকিৎসক, মেডিকেল কলেজ) ১২) প্রধান সমন্বয়কারী-জনাব হেমায়ত উদ্দিন আহম্মেদ (এ্যাডভোকেট) ১৩) কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বে ছিলেন মাকসুদ আলী বাদল ও জনাব লুৎফর রহমান। ২৬ মার্চ বিকেল থেকেই প্রতিরক্ষা প্রধান মেজর এম.এ. জলিল (পরবর্তীতে ৯নং সেক্টর কমান্ডার)-এর নেতৃত্বে বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ কার্য শুরু হয়। ২৮ মার্চ বেলস্ পার্ক (বঙ্গবন্ধু উদ্যানে) প্রশিক্ষণের প্রধান ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। সর্বথ্র চলতে থাকে গেরিলা যুদ্ধ ও সম্মুখ যুদ্ধের প্রস্তুতি প্রশিক্ষণ। দক্ষিণাঞ্চলের জিলাগুলোর সাথে সার্বক্ষনিক সংযোগ রক্ষার জন্য তখন কালেখ্ট্ররেটের ওয়ারলেস যন্ত্রটি এই বিদ্যালয় থেকেই পরিচালিত হত। সর্বস্তরের জনগণ স্বঃস্ফুর্তভাবে সচিবালয়ের কর্মতৎপরতার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। বৃহত্তর বরিশাল ও পটুয়াখালি জেলার সমগ্র বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসন এই সচিবালয় থেকে পরিচালিত হত। এর বাইরে খুলনা জেলা ও চাঁদপুর জেলা পর্যন্ত এই সচিবালয়ের প্রশাসন ও কর্মতৎপরতা বিস্তৃত ছিল। প্রকৃতপক্ষে পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ৯নং সেক্টরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, সুসংগঠিত ও পরিচালনা ২৬ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত একমাস সম্পূর্ণভঅবে এই বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত সচিবালয়ের সার্বিক কর্তৃত্ব ও তত্ত্বাবধানে সম্মাদিত হয়েছে। ১৮ এপ্রিল, ১৯৭১ সাল বেলা 11 টা নাগাদ পাক বাহিনী জঙ্গী বিমান বরিশাল শহরের উপর বোমাবর্ষণ করে। সাথে সাথে বিমান বরিশাল শহরের উপর বোমাবর্ষণ করে। সাথে সাথে বিমান থেকে মেশিনগানের গুলি চালান হয়। মেশিনগানের গুলির আঘাতে বিদ্যালয়টি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বিদ্যালয় ভবনের দেয়ালগুলো ক্ষতবিক্ষত হয় এবং গাছগুলো পত্রশূন্য হয়ে যায়। কিন্তু সচিবালয়ের কাজ তখনও বন্ধ হয়নি।২৬ এপ্রিল পাক-বাহিনী জলে-স্থলে ও আকাশ পথে বরিশাল শহর ও শহরতলীর উপর ত্রিমুখী আক্রমণ চালায়। গানবোট, জঙ্গীবিমান ও যুদ্ধ জাহাজের আক্রমণ প্রতিহত করার মত কোন অস্ত্র বুক্তিবাহিনীর হাতে না থাকা সত্ত্বেও দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ মুক্তিবাহিনীর সদস্যগণ অদম্য সাহস ও মনোবল নিয়ে পাক-বাহিনীর মোকাবেলা করে। সারাদিন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর মুক্তিবাহিনীর পিছু হটতে বাধ্য হয়। পাকিস্তানের কবল থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করার রক্ত-শপথ নিয়ে তারা গেরিলা যুদ্ধের পরিকল্পনা অনুযাযী নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। বিকেল ৪ টা নাগাদ পাক-বাহিনী বরিশাল শহরে প্রবেশ করে প্রথমেই বরিশাল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে হানা দেয়। তাদের তান্ডবে সমগ্র বিদ্যালয়টি ধ্বংশস্তুপে পরিণত হয়। িএভাবে একমাস ব্যাপী মহান দায়িত্ব পালনের পর স্বাধীন বাংলার প্রথম সচিবালয়ের অবলুপ্তি ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক বিপুল ঐতিহ্য বহন করে বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সগৌরবে শ্রেষ্ঠত্বের মহিমা নিযে এগিয়ে চলেছে। শিক্ষা, ক্রিড়া , সংস্কৃতি, মানবকল্যাণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অন্তরে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার ক্ষেত্রে এই বিদ্যালয়ের ভূমিকা দক্ষিণ বাংলার শ্রেষ্ঠত্ব দাবি রাখে।।